কর্নেল স্যান্ডার্সঃ আত্মহত্যা থেকে কেএফসি

কেএফসি তে চশমা পরা সাদাসিদে এক বৃদ্ধকে অনেকেই দেখেছেন। হাতে মুচমুচে ভাজা মাংসের থালি।প্রায়ই এমন একটা ছবি রেস্তোরার দেয়ালে লেগে থাকতে দেখা যায় ।

এই মানুষটির নাম কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স ।

তিনি একজন আমেরিকান ব্যবসায়ী ছিলেন, তিনি ফাস্ট ফুড মুরগির রেস্তোঁরা চেইন কেনটাকি ফ্রাইড চিকেন প্রতিষ্ঠার জন্য বিখ্যাত।

এবং পরে সংস্থার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর এবং প্রতীক হিসাবে অভিনয় করার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন।

তাঁর নাম এবং চিত্র এখনও সংস্থার প্রতীক।

তবে আপনি জানেন কি, তাঁর এই রেসিপিকে জনপ্রিয় করতে ওই মানুষটাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল জীবনের বাষট্টি বছর।

আমেরিকার ইন্ডিয়ানায় জন্ম ১৮৯০-এর ৯ সেপ্টেম্বর। বাবা উইলবার ছিলেন কৃষক। মা, মার্গারেট ব্যস্ত থাকতেন ঘরসংসার নিয়ে। মার্গারেট ছিলেন ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক।

তিন ভাইবোনের মধ্যে সবথেকে বড় ছিলেন স্যান্ডার্স।

পাঁচ বছর বয়সে, হঠাৎই মারা যান তাঁর বাবা। সংসারে দায়িত্বে কাজে যেতে হল তার মা কে। ছোট দুই ভাইবোনকে দেখভালের দায়িত্ব পড়ল স্যান্ডার্স এর উপর।

আরো পড়ুনঃ  ফিদেল কাস্ত্রোঃ এক মহান বিপ্লবীর আত্মকথা

ভাইবোনদের খাওয়ানোর জন্যে নিজেই আবিস্কার করলে মাংস ভাজার রেসিপি। দু বছরের মাথায় মাংস ভাজায় পটু হয়ে উঠলেন স্যান্ডার্স।

কিন্তু এভাবে আর না চলায় অল্প বয়সেই তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান এবং ক্ষেত-খামারির কাজে লেগে যান।

মা মারগারেট অন্য জায়গায় বিয়ে করার পর দুই ভাইবোন নিয়ে একা হয়ে যান স্যান্ডার্স।

মাত্র তেরো বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে চলে যান স্যান্ডার্স।

ফুটবলের কিংবদন্তী দিয়েগো মারাদোনা

এরপর তিনি রেলওয়ে কর্মী, গ্যাস স্টেশন অপারেটর, ইন্সুরেন্স সেলসম্যান সহ আরো অনেক পেশায় জড়িয়েছিলেন কিন্তু কোনটিতেই সফলতা পাননি।

১৯ বছর বয়সে রেলওয়েতে চাকরি করার সময় বিয়ে করেন জোসেফিনকে ।

জন্ম হয় এক ছেলে, দুই মেয়ের। টনসিলের সংক্রমণে পুত্রসন্তান শৈশবেই মারা যায় ।

চাকরির পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়ার প্রস্তুতি নেন তিনি। ঠিক তখনি রেলওয়ের চাকরি চলে যায় স্যান্ডার্সের।

রুজি রোজগার না থাকায় স্ত্রী জোসেফিন মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান।

আরো পড়ুনঃ  হ্যারি পটার ও জে কে রাউলিং

জিবনে ব্যর্থতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে যখন আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন তখন তিনি আবিষ্কার তিনি একটি সিক্রেট রেসিপি জানেন।

আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত ত্যাগ করে তিনি  Kentucky Fried Chicken (KFC) প্রতিষ্ঠা করেন। শুধুমাত্র মুরগিকে একটু কড়া করে ভাজার রেসিপি, এটাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

পরিচিতদের খাওয়াতে লাগলেন তাঁর তৈরি মাংস ভাজা। এরপর কেন্টাকির এক গ্যাস স্টেশনে, যেখানে তিনি কাজ করতেন, সাজিয়ে রাখলেন তাঁর তৈরি ফ্রায়েড চিকেন।

খাবারের স্বাদ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় তিনি এই ব্যবসাকেই গুরুত্ব দিলেন। ধীরে ধীরে ফ্রায়েড চিকেন বিক্রিই হয়ে উঠল তাঁর মূল ব্যবসা। তাঁর নতুন পরিচয় হল ‘কর্নেল অব কেন্টাকি’।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য বন্ধ হয়ে গেল তাঁর ব্যবসা। কয়েক বছরের বিরতি।

তারপর ১৯৫২ সালে আমেরিকার উটা-তে সাউথ সল্টলেক এলাকায় আত্মপ্রকাশ করল হারল্যান্ড স্যান্ডার্সের রেসিপিতে তৈরি মাংসভাজার দোকান।

যেহেতু যাত্রা শুরু হয়েছিল কেন্টাকি থেকে, এর নাম হল, ‘কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন’ বা কেএফসি ।

আরো পড়ুনঃ  জেফ বেজোস - বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও অ্যামাজনের গল্প

দিনদিন বিক্রির পরিমাণ বাড়তে লাগল এবং বর্তমানে বিভিন্ন দেশে KFC-র প্রায় ৬০০ এর মত শাখা রয়েছে। তিনি নিজে KFC এর ব্র্যান্ড এম্বাসেডর ছিলেন।

প্রায় ১২ বছর তিনি কেএফসি পরিচালনা করার পর এটি ২ মিলিয়ন ডলারে (বর্তমানে ১৫.৪ মিলিয়ন ডলার) বিক্রি করে দেন।

১৯৮০ সালের ১৬ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুভল শহরে মারা যান তিনি।

বর্তমানে স্যান্ডার্সের ভাজা মুরগির রেসিপি পৌঁছে গেছে বিশ্বের কোণায় কোণায়।