গল্পটা আর কারো নয়

ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করছি অনেক্ষন ধরেই ।চোখ বুজে রেখেও ঠিকই বুঝতে পারছি ডীম লাইটের আলোটা ।

ফ্যানের বাতাসে টেবিল ক্লথটা একটা ভয়ঙ্কর আওয়াজ বমি করছে ।

পা দিয়ে পর্দার দুলুনিটা কমানোর চেষ্টা করছি । বারবার মনে পড়ছে আজকে বিকালের কথা , বৃষ্টির কথা ।

বৃষ্টি আমাদের পাড়ার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা।

বলতে পারেন আমার দেখা এই পর্যন্ত সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে । লাল টুকটুকে একটা জামা পড়ে বাবার সাথে বাসা থেকে বের হয়েছে ।

পায়ে ব্যথা পেয়েছে বলে হয়ত তার বাবা ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন । বারান্দায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখছিলাম আমি ।

ভেন্টিলেটারে নতুন দুইটা চড়ুই পাখি বাসা বেধেছে । চড়ুই পাখি আমার সবসময়ই প্রিয় ।

ছোট বেলায় অনেক বার চড়ুই পাখি নিয়ে অনেক বকা খেয়েছি । একবার স্কুলে চড়ুই পাখি ধরতে গিয়ে ব্রেঞ্চ থেকে পড়ে পা মচকিয়ে ছিলাম ।

বৃষ্টিকে প্রথমবার আমি বারান্দায় বসে থাকতে দেখেছিলাম । অসম্ভব এক মায়া মেয়েটার চেহেরায় । ওর ছোট ভাইয়ের সাথে পরিচয় থাকায় ওর নামটা জানতে পেরেছি ।

আরো পড়ুনঃ  রাতটা আরো দীর্ঘ হোক

মাঝে মাঝে বৃষ্টিদের বাসা থেকে কান্নার আওয়াজ পেতাম । কার কান্না জানি না । বৃষ্টির চেহারাটা বার বার চোখের সামনে ভাসছে । ঘুমোতে পারছি না ।

আস্তে আস্তে দরজাটা খুলে ছাদে গেলাম । প্রায় অর্ধেকটা চাঁদ কয়েকটা তারাকে সাথে নিয়ে একা একা এত্ত বড় একটা আকাশে একা ঝুলে ঝুলে রাত কাটাচ্ছে ।

এর কোন মানে হয় ?

এত সুন্দর চাঁদ, কত কবি , কত লেখক এর পাগল , কত জন কবি হয়েছে তাকে ভালোবেসে । একটা বিয়ে করে সারাটা আকাশ জমিয়ে বউ এর সাথে গল্প করে রাতটা পার করতে পারত !!

আসলে সৃষ্টির অস্তিত্ব একটাই , নিঃসঙ্গতা !

হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে মনটা ভরে গেল ।
রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো গুলোও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে । বাসার সামনের বাতিটা আজ জ্বলছে না । পাড়ার কোন ইঁচড়েপাকা হয়ত গোলেল দিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে ।

সা সা শব্দে মাথার উপর দিয়ে একটা প্লেন চলে গেল ।
আবার রাস্তার দিকে তাকিয়ে বিকেলের বৃষ্টির হেটে যাওয়াটা আবার দেখতে চেস্টা করলাম । কাজ হল না !
আমার মনে হয় বর্তমান ভবিষ্যৎ বলে কিছুই নেই । সবই অতীত ।

আরো পড়ুনঃ  অতঃপর-প্রেম

বৃষ্টি প্রায় আমার সমবয়সীই হবে । ওর কথা বলা,হাসি,পথচলায় আমি পথভোলা হয়ে যেতাম । নাসিকের সাথে মাঝে মাঝে ওদের বাসায় আসা যাওয়া শুরু হয় আমার ।

নাসিক ওর ছোট ভাই । মাঝে মাঝে দুই একবার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি বৃষ্টিকে ।

একদিন জিজ্ঞেস করে ফেললাম নাসিককে । বৃষ্টি এভাবে তাকিয়ে কি দেখে ? আপু দেখবে কি ? ও তো চোখে দেখে না । হেসে হেসে কথা গুলো বলল নাসিক । মজা করছে হবে হয়ত তাই পাত্তা দিলাম না ।

আম্মুর কাছে জানলাম মেয়েটা নাকি সত্যিই চোখে দেখে না ! কোন মানে হয় এইসব ফাইজলামির ?


কিন্তু না , বৃষ্টি সত্যিই চোখে দেখে না । কিভাবে সম্ভব ? যে মেয়েকে দেখলে আমার পৃথিবী রঙ্গিন মনে হয় সেই মেয়েকে কিভাবে সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর রঙ থেকে বঞ্চিত করবে ?

বৃষ্টির সাথে আমার সখ্য বাড়তে থাকে দিন দিন । আরও কাছে আসতে থাকি বৃষ্টির ।
মাঝে মাঝে বৃষ্টি আমাকে জিজ্ঞেস করত “তুমি দেখতে কেমন” ? “কি করছ এখন” ?
বৃষ্টির এমন সব প্রশ্নে আরও বেশি ভালো লাগত বৃষ্টিকে ।

আরো পড়ুনঃ  দ্বিতীয় ছায়া

একটা সময় বুঝতে পারি আমি ভালোবেসে পেলেছি বৃষ্টিকে ! বৃষ্টির সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আজ চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছে ।


বাবার বদলি হয়ে যাওয়ায় আমরা আগামিকাল চলে যাচ্ছি । বৃষ্টির সাথে আমার আজকে বিকেলের দেখাই শেষ দেখা । হয়ত এই জীবনে আর দেখা হবে না ।

আমারা এখান থেকে চলে যাচ্ছি শুনেও বৃষ্টি আমাকে কিছুই বলে নি । হয়ত বলতে চেয়েছিল অনেক কিছুই ।

পাহারাদার কাকুর বাঁশির আওয়াজে এতক্ষনের কল্পনার ঘোর কাটলো আমার ।

চারিদিকে এক অদ্ভুত নির্জনতা । বৃষ্টিও হয়ত এই নির্জনতায় এপাশ-ওপাশ করছে।

শব্দগুলোকে গলা টিপে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে “আমি তোমায় ভালবাসি’’।

পৃথিবীর সব খুশি মেঘ হয়ে আকাশে না থেকে বৃষ্টি হয়ে ঝরুক বৃষ্টিতে।