রঙ পেন্সিল

লিখেছেনঃ অন্তসার শুন্য

কি করলাম আমি এটা ? বাবা তো আমার কাছে বেশি কিচ্ছু চায়নি । বলেছিল শুধু পরিক্ষায় একটা ভালো রেজাল্ট করতে, তাও পারিনি । আবার একটা সরকারি ইউনিভার্সিটিতেও চান্স পাইনি ।

কোন কিচ্ছুতেই শান্তি পাচ্ছি না । নিজেকে কিভাবে শাস্তি দেয়া যায় ? আইডিয়া !! বিছানার নিচে গতকাল শেভ করে একটা ব্লেড রেখেছিলাম । ইয়েস ইয়েস !! আই গট ইট ! কিভাবে কাটব ? বেথা হবে না তো ? ধুর !!! বন্ধুদের অনেকেই দেখেছি এরকম করে ! তাছাড়া আমার রেজাল্টে বাবা যে বেথা পেয়েছে এর চেয়ে তো আর বেশি হবে না !

উফফ… কেমন জানি ? পিঁপড়ার কামড়ের মত লাগল কিছুটা । একটু একটু রক্ত বের হচ্ছে ।
আমি যদি এখন মরে যাই ? আমি মরে গেলে মারিয়ার কি হবে ? আচ্ছা আমি যে ওকে ভালোবাসি ও কি জানে ? নাহ……জানবে কিভাবে আমি তো বলিনি কখনো ।

ও কি বোঝে আমি ওকে ভালোবাসি ? হয়তো বোঝে !
ধুর শালার এত ডং করার কি দরকার হাতের রগ টা কেটে দিলেই ব্যাস…… শান্তি আর শান্তি !
-হ্যালো… আম্মু ?
– কইরে তুই?
-বাসার ছাঁদে ……
-এক্ষুনি ঘরে আয় ……
-আসছি

আম্মু আমার রুমে খাবার দিয়ে গেল । হয়তো বাবার বকা থেকে বাঁচাতেই আম্মু এমনটা করেছে । ভালই তো …
খিদে নাই । খেতে ইচ্ছে করছে না । ঘরের বাতিটা নিভিয়ে একা একা বসে কাঁদব ? ধুর…… গলা ছেড়ে না কাঁদলে মজা নাই । জানালার গ্লাসটা একটু সরিয়ে বসে বসে চাঁদটা দেখছি ।

চাঁদটাও কেমন জানি আলো ছড়াতে ছড়াতে হাফিয়ে গেছে ! ঠিক আমার মত । আমি অবশ্য আলো ছড়াই না তবে চাই প্রত্যেকটা মানুষকে আমি ভালোবাসি,সবাই আমাকে ভালোবাসুক । আর যে সবাইকে ভালোবাসতে পারে সে তো আলোও ছড়াতে পারে । আমার তো তাই মনে হয় । ভালোবাসাটাও একটা আলো !

এত সকাল সকাল এত চিৎকার চেঁচামেচি ! ঘটনা কি ? রুম থেকে বের হয়ে দেখি বাবা ভাংচুর করছে হাতের কাছে যা পায় তাই ! আম্মু অসহায়ের মত ভাঙ্গা কাচের টুকরো খুঁড়াচ্ছে !

“আর একবার যদি কস তর পোলারে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর কথা তবে তর সাথে আমার সংসার শেষ” –পাশের রুম থেকে বাবার আওয়াজ ।
টিশার্ট গায়ে চাপিয়ে হনহন করে বের হয়ে আসলাম ঘর থেকে । এত অশান্তি আর ভাল্লাগে না । মুক্তি চাই আমি । ভালো থাকতে চাই । কয়েকদিন আগেও বাবা মদ খেয়ে আম্মুর গায়ে হাত তুলেছে । অনেক কেদেছিলাম আমি সেদিন ।

আমি বড় হয়ে আম্মুকে নিয়ে থাকব । অনেক টাকা রুজি করব । তারপর থেকে কয়েকদিন পড়েছিলামও অনেক । ভালো পড়ালেখা না করলে ভালো চাকরি পাবো না এই জন্য । পড়া লেখা এইসব আমাকে দিয়ে হয় না । আমি শুধু আঁকতে পারি । যা দেখি সব কিছুই সাঁজাতে চাই অন্য রকম একটা নতুন রূপে আমার ক্যানভাসে । আমার ক্যানভাসটাও বাবা ভেঙ্গে পেলেছে । সত্যি বলতে কি বাবাকে আমার আর বাবা বলতে ইচ্ছে হয়না । আমার বাবা না হলে মেরে জেলে যেতাম নিশ্চিত !!

আজকে বন্ধুদের সাথে প্রথম চিগারেটে টান দিলাম । এইটা খেলে নাকি টেনসন দূর হয় । কিসের টেনশন দূর হয় উলটা বমি করে শেষ । একটু পরে আরেকটা চিগারেট কিনে এনে ধরালাম । আগের মতই হল । শালার চিগারেট খাওয়াটা আমার শিখতেই হবে ।

মারিয়াদের বাসার বারান্দায় একটা শালিক পাখি আছে । খুব মন খারাপ থাকলে আমাদের বারান্দা থেকে আমি পাখিটার সাথে কথা বলি । পাখিটাও আমার সব কথা বুঝে ! শুধুই যে পাখি দেখার জন্য বারান্দায় বসে থাকতাম তা না । এতটা ভালো ছেলে আমি নই ! মাঝে মাঝে মারিয়ার সাথেও দেখা হয়ে যেত । অল্প সময়ের জন্য হলেও মনে হতো আমি ভালো আছি ! আমার রঙপেন্সিল গুলো সবসময় আমার টেবিলের উপর রাখতাম আমি । মারিয়াকে যতবার দেখেছি ততবার আমি ওর চেহারা টা তুলির ডগায় আনতে ছেয়েছি । কক্ষনোই পারিনি । সত্যি বলতে আমি ওকে এখনো ভালো করে দেখি নি । ভালোবাসা দেখা থেকে হয় আবার না দেখা থেকেও হয় । আবার অনেক সময় ভালোবাসাটা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায় ।

আরো পড়ুনঃ  বিখ্যাত উক্তিঃ হুমায়ূন আহমেদ

“আমি তোমাকেই বলে দেব
কি যে একা দীর্ঘ রাত
আমি হেটে গেছি বিরান পথে ,
আমি তোমাকেই বলে দেব
সেই ভুলে ভরা গল্প
কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায় ,
ছোঁয়ে কান্নার রঙ ছোঁয়ে জ্যোৎস্নার ছায়া ।”


এই মুহূর্তে এই গানটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় । অনেককিছুই ঠিক করে রেখেছি । কোনোদিন সুযোগ হলে বলব !

বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল আমি বড় হয়ে অনেক কিছু করব ।এটা করব ওটা করব । অনেক ভালো রেজাল্ট হবে আমার আর বাবা সবাইকে বলবে “আমার ছেলে ভালো রেজাল্ট করেছে” । আরো অনেক কিছু । বাবাকে যখন প্রথম বলেছিলাম আমার ড্রয়িং ভালো লাগে বাবা পাত্তা দিল না । উলটো পাঁচ সাতটা বিপরীত লিঙ্গের উদাহরণ দিয়ে বসল ।

একবার বাবা অফিস থেকে ফিরেছে আমি অনেক আশা নিয়ে সারাদিন বাবার অপেক্ষায় ছিলাম চিত্রাঙ্কনে প্রথম হয়েছি এইটা বলব বলে । বাবা আমার পুরো কথা শুনার আগেই যে ঝাড়ি দিয়েছিল সেদিন থেকে ভেবেই নিয়েছিলাম আর যাই করি ড্রয়িং আমি ছাড়ছি না ! আগে বাবা আমায় রঙ পেন্সিল কিনে দিত অবসরে টুকটাক কিছু একটা করে সময় কাটাতে । খারাপ ছেলেদের সাথে যেন না মেশি এইজন্যও হয়তবা । আমি নিজেও কখনো বুঝিনি আমার এই সময় কাটানোটাই আমার নেশা হয়ে যাবে ।

আসলে প্রত্যেক বাবা-মারই উচিৎ সন্তানের ভাললাগাটাকে একটু গুরুত্ব দেয়া । আমি হয়ত আমার বাবার সহযোগিতা পেলে রঙ তুলি দিয়েই কিচ্ছু একটা করতে পারতাম ! আমাদের দেশের একটাই সমস্যা , এ দেশের ছেলেমেয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করেন আমার বাবার মত মা-বাবারা । দোষটা শুধু বাবা মাকে দিলে ভুল হবে দোষ আমাদের পুরো সিস্টেমটায় । ছোট বেলা থেকেই লিখে আসছি ,শিখে আসছি “aim in life” মানেই ডাক্তার/ ইঞ্জিনিয়ার । সবার বাবা মা চায় তাদের সন্তান ডাক্তার/ ইঞ্জিনিয়ার হোক ।

আর আমাদের বইয়েও জোর দিয়ে লেখা এইসব কথা । আসলে আমরা এই দুইটার বাইরে চিন্তা করতে পারি না । আমাদের চিন্তা সীমিত ।

ইদানীং কিচ্ছুই ভালো লাগে না আমার । মরে যেতে ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে । ঘরে থাকতে পারি না ।বাহিরে যেতে পারি না । কি দোষ আমার ? সাথের সব বন্ধুরা ভালো ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাইছে এই জন্য ? আমার রেজাল্ট খারাপ এই জন্য ? নতুন একটা ব্লেড কিনে আনছিলাম গতকাল ।

আরেকবার চেষ্টা করে কি দেখব ? নাহ আমাকে দিয়ে এই সব সুইসাইড টনিক খাওয়া হবে না । গত বছর বনিকের মেয়ে রুপালি পোয়াতি কুমারি কি সুন্দর করে টনিকটা হযম করেছে ! সব কষ্ট শেষ ! হাসপাতালে নিতে নিতেই খেলা শেষ । আসলে সুইসাইড নামের জিনিসটাই একটা টনিক ! সেটা যেভাবেই হোক না কেন !

মারিয়া ছাদে কাপড় শুকাতে দিত প্রায়ই । দুপুরের রোঁদ অর্ধেকের বেশি আকাশ ভ্রমন করে আসত তখন । মারিয়ার ছায়াটা বিরাট আকারের একটা মূর্তির মত হয়ে আসত আমার জানালায় ।

কখনো কখনো হাত নেড়ে ইশারা করতাম আমি । বিরাট ছায়াটা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসত । এক সময় মিলিয়ে যেত । মারিয়ার ছায়া নিয়ে আমি অবশ্য আমি একটা সুত্র বানিয়ে ছিলাম “বাধাপ্রাপ্ত আলোর পথ যে পিঠে ছায়া সৃষ্টি করে সেই পিঠের দূরত্ব যদি বাধাপ্রাপ্ত বস্তুর দ্বিগুণ হয় বা তার চেয়ে বেশি হয় তবে সেটা দেখা যায় না” । কপাল ভালো আইনস্টাইন, নিউটনের মত কেউ বেচে নেই নইলে সিউর কেইস খাইতাম ।

রাত নয়টা বাজে এখন । বাসার সামনের দোকান থেকে একটা চিগারেট কিনে টানতে লাগলাম । চিগারেট খাওয়াটা শিখে পেলেছি প্রায় । ভালই লাগে । মাথায় কেমন জানি একটা ভু ভু ভাব । ধোঁয়া গুলো গিলতে থাকলাম অল্প অল্প করে । প্রত্যেকবার ধোঁয়া গিলার সময় চোখ কেমন জানি ভিজে আসছিল ।

আরো পড়ুনঃ  অতঃপর-প্রেম

আমার কি কখনো এই চিগারেট নামের অখাদ্যটা খাওয়ার কথা ছিল ? অবশ্য এতে একটু হলেও নিজের থেকে আলাদা থাকতে পারি আমি । বসে বসে ট্রাফিকের আওয়াজ গুনতে লাগলাম । সবাই কত বেস্ত এই ছোট শহরটাতে । ফাগুণের পহেলা ঠাণ্ডা বাতাসটা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছেনা আমার । চিগারেটটাও এতক্ষণে শেষ । বাতাস না থাকলে আরো একটু সময় টানা যেত । মাথাটা ঝিম ঝিম করছে ।

একটু একা বা সব অশান্তি থেকে একটু বিরতি পেলেই বুদ হয়ে থাকতাম মারিয়ার কল্পনায় । আমার প্রতিটা অলস সময়ে সাজিয়েছি মারিয়াকে আমার মত করে । মারিয়া বারান্দার শালিক পাখিটাকে এটাওটা শিখাত আর আমি জানালায় উকি মেরে দেখতাম কি অদ্ভুত মায়া মেয়েটার চেহারায় ।

খাঁচা থেকে বের করে গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে দিত, চুমো খেতো । ইসস আমি মানুষ না হয়ে যদি পাখি হতাম । মারিয়ার খাঁচায় বন্দি থাকা শালিক পাখি ।

বন্ধুরা সব ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে গেছে । কেউ পাবলিকে কেউ প্রাইভেটে । বাবা খরা করে বলে দিয়েছে আগামিতে আবার পরীক্ষা দিয়ে চান্স না পেলে আমার পড়ালেখা এখানেই শেষ ! আমি ভালো করে জানি আমি চান্স পাবো না । পরের বার আবার বাবার হাতের মার খাওয়ার চেয়ে সুইসাইড টনিকটাই বেটার হবে বলে মনে হয় ! পরের বছর আসতে অনেক দেরি এর মাঝে আমার বাকি পেন্সিলগুলোর কালি শেষ করে নিতে হবে ।

আমি না থাকলে কে ব্যাবহার করবে এইসব । আরো একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে । মারিয়াকে বলতে হবে আমার মনের কথাটা । মারিয়া রাজি থাকলে টনিক সেবন কেনচেল ! ওকে নিয়ে পালিয়ে যাবো অনেক দূরে । হয়ত যেখানে আজো কারো পায়ের চিহ্ন পরেনি !!

অনেক চিন্তা ভাবনার পর একদিন মারিয়াদের বারান্দায় একটা চিরকুট ঢিল মেরে চুড়ে দিলাম । চিরকুটে লিখা ছিল “মারিয়া, জানিনা আমি কিসের টানে তোমার প্রেমে পড়েছি । হয়ত তোমার সৌন্দর্যে ! আমি জানি না আসলে ভালোবাসা কিভাবে হয় আদৌ কি কোন সংকেত দিয়ে আসে কি না । তোমার জন্য আমার যে অনুভূতি , ওটাকেই আমি ভালোবাসা নাম দিয়েছি ।

আমার জন্য তোমাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে হবে না । গাঢ় কাজল লাগাতে হবে না । বড় কোন লাল টিপ লাগাতে হবে না কপালে । কিংবা বলব না তুমি নীল শাড়ী আর আলতা পড়ে এসো । আমি তোমাকে সাঁজাতে চাই ঠিক আমার মত করে যেমনটি সাঁজাই আমার কল্পনায় । একটা সুযোগ দিবে আমায় ?”

কোন সাড়া নেই । দু দিন হয়ে গেল ।

পরদিন বিকেলে খুব মন খারাপ নিয়ে হেডফোনে গান শুনছি – “লেট মি বি ইউর হিরো বেবি” ! আম্মু ঝড়ের মত ঢুকলেন আমার ঘরে ।কান থেকে হেডফোনটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন বসার ঘরে ।

আমি রীতিমতো টাস্কি খেয়ে গেলাম ! সোফায় মারিয়ার মা বসে আছেন । হাতে পরিচিত একটা কাগজের টুকরা ! তবে কি চিঠিটা মারিয়ার মা পড়ে ফেলেছেন । কি করলাম আমি এটা । লজ্জায় কি বলব , কি করব বুঝতে পারছিলাম না । আম্মু হঠাৎ উঠে এসে টাস করে একটা চড় মারলেন ।

আমার ঐ সময়টাতে ঐখান থেকে চলে যাওয়ার কথা । কিন্তু না ! আমি অনড় হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম । মনে মনে নিজেকে অনেক হীন একটা প্রাণী ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছিল না । আমার সাথেই কেন এমন হওয়া লাগবে ? সবসময় আমিই কেন ?
একটা চিগারেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া টানছি আর ভাবছি সবই তো শেষ । আম্মু আমাকে কি ভাববে ? নিশ্চই অনেক খারাপ ভাববে । আর ভাববেই বা না কেন ? খারাপ না হলে কি পাশের বাসার মেয়েকে প্রেমপত্র দিতাম ! বাবা জানলে হয়তো মেরেই ফেলবে । কেন যে দিতে গেলাম চিঠিটা । ধুর……… ভাল্লাগেনা ।

মারিয়াও হয়ত জেনে গেছে আমি কিছু একটা করেছিলাম । ও হয়ত অনেক হাসবে ব্যাপারটা নিয়ে । আর যদি কিছুটা হলেও আমাকে ভালোবাসে তাহলে আফসোস করবে ।

আরো পড়ুনঃ  আমার খোলা আকাশ

ভালোই যাচ্ছে দিন কাল । সব কিছু টিকটাক । বাবা বাসায় নেই । আমিও আমার ড্রইং ইচ্ছা মত করতে পারি । কানে হেডফোন লাগিয়ে ড্রয়িং করার মজাটাই আলাদা । মারিয়াকে আমার মনের কথা বলতেই হবে ! অনেক কিছু ভেবে রেখেছি । একদিন বলেই দিব ।

আগামিকাল মারিয়ারা বাসা বলদে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে । কথাটা শুনে বুকের ভেতরটায় একটা অযাচিত ভাঙচুর শুরু হলে গেল । বিকেলের সূর্য টিক লাল একটা টিপের মত আকাশের কোনায় ডুবু ডুবু করছে । বারান্দায় দাড়িয়ে মারিয়াকে দেখার চেষ্টা করলাম অনেক ।

ছাঁদে বসে নখ কুটছি । ভেতর থেকে এক ফোটা কষ্ট চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল । বাবা বাসায় নেই । বাবাকে অনেক দেখার ইচ্ছা করছে । বাবার কোন চাওয়া আমি পূর্ণ করতে পারিনি । আমি কতোটুকো পেলাম আর না পেলাম সে হিসাব আমার জানা নেই । মারিয়াকে একবার দেখার ইচ্ছা হচ্ছে । ইচ্ছে করছে চিৎকার করে বলি “আম্মু আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি । মনে পড়ছে পরশ, রিয়ন আর সুদীপের কথা । শালারা গতবছর আমার জন্মদিনে কি এক কাণ্ড ঘটিয়েছিল । রাতে দেয়াল টপকিয়ে আমার বাসায় এসে হাজির ।

বাসার সবাই ঘুমুচ্ছে এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ ! এত রাতে আবার কে এলো ? বাবা তো পাশের বাসার আঙ্কেলকে ফোন দিয়ে জানিয়েই দিয়েছিল কি জানি আবার কোনো ডাকাত টাকাত আসল নাকি । দরজা খুলতেই পরশ ঘরে ঢুকে বাবাকে সালাম করল । আমি তো হাঁ করে দেখছিলাম বাবা এই মুহূর্তে কি কি করতে পারে ! “সাইমুমের বার্থডে আজকে তাই সারপ্রাইজ দিতে চলে এলাম” বলল পরশ … এমন সময় পিছন থেকে রিয়ন আর সুদীপ “হ্যাপি বার্থডে” বলে একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো ।
সামনের বার্থডেতে হয়ত এমন সারপ্রাইজ পাবো না । হয়তো আর কখনোই না ।

ইন্টারে পরেছিলাম “মানুষ মরে গেলে পচে যায় , বেঁচে থাকলে বদলায় ।” আচ্ছা আমি মরে গেলে কি কেউ আমাকে মনে রাখবে না ? আম্মু হয়ত কিছুদিন কাঁদবে । না কিছু দিন নয়…… অনেকদিন কাঁদবে । আমিতো একাই ।

আমি মরে গেলে আম্মু আর কাকে আদর করবে ? আমার এখনো মনে আছে । প্রায় ক্লাস টেন পর্যন্ত রাতে আম্মু খাইয়ে না দিলে খাওয়া হতো না । বই সামনে নিয়ে ঘুমিয়ে পরতাম আমি । আম্মু ভাত নিয়ে এসে আমায় খাইয়ে দিতো । মাঝে মাঝে ধমক দিত “বড় করে হাঁ কর” ঘুমে আমি চোখ মুখ কিছুই খোলতে পারতাম না !

অনেকদিন আম্মুর এই ধমকটা খাওয়া হয়না । অনেকদিন আম্মু আমায় খাইয়ে দেয় না । আমি বড় হয়ে গেছি । আসলে অনেক বড় হয়ে গেছি ! এখন তারাদের বাড়ি যাওয়ার সময় আমার !

পকেটে থেকে থেকে ব্লেডটা বিরক্ত হয়ে আছে । এবার এটাকে কাজে লাগানো যাক ! আমি মুক্তির স্বাদ পেতে যাচ্ছি । ভাবতেই মনটা লাফিয়ে উঠলো । দুহাতে চোখটা মুছে নিলাম ।

আহ… কি লাল টকটকে গরম রক্ত । গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে হাতের কব্জি থেকে !

নেতিয়ে যাচ্ছে আমার শরীর । চোখ বুঝে আসছে । ছাঁদে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকলাম ।
তখনো আমার ঠোট দুটি হালকা নড়ছে ।

বুক পকেটের নিচে কেমন জানি একটা বেথা । অনেকটা অপূর্ণতার বেথা । কিছু না পেয়ে হারানোর বেথা ।

মারিয়া এতদিনের পোষা শালিকটা মুক্ত করে দিয়েছে । পাখিটা উড়ে যেতে থাকল অনেক দূরে , অজানায় ।
আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম পাখিটার দিকে । আমারো সময় আসছে পাখি হয়ে উড়ার ,দূর দিগন্তে ,মেঘ ছোঁয়ে , মেঘের সাথে পাল্লা দিয়ে ।

শেয়ার করুনঃ