হাচিকো – একটি বিশ্বস্ততার গল্প

বিশ্বস্ততার গল্প তো আমরা অনেক শুনেছি। চলুন আজকে একটি ভিন্ন ধরনের সত্য গল্প শুনি। হাচিকো নামটি যারা শুনেন নি তারা গুগল করে দেখতে পারেন।

আর জাপানে যারা থাকেন বা যাদের আত্বীয় স্বজন আছে জাপানে তারা হয়ত শুনেছেন নামটি।

এটি কোন মানুষের নাম নয়। হাচিকো জাপানের বিশ্বস্ততার প্রতিক একটি কুকুরের নাম। হ্যাঁ !! ঠিকই শুনেছেন। হাচিকো জাপানের একটি বিখ্যাত কুকুরের নাম যার নামে রিতিমত বানানো হয়েছে ভাষ্কর্য।

বানানো হয়েছে হলিউড সিনেমা প্রকাশ হয়েছে ডজন খানেক বই।

জাপানের অদাতে শহরের অদুরে ১৯২৩ সালের ১০ নভেম্বর জন্ম হয় হাচিকোর। ১৯২৪ সালে সোনালি বাদামি রঙের এই আকিতো প্রজাতির কুকুরটিকে ঘরে নিয়ে আসেন টোকিও ইউনিভার্সিটির কৃষি বিভাগের প্রফেসর  হিদেসাবুরে উয়েনো।

হাচিকোর মুল ছবি

যেভাবে জনপ্রিয় হল হাচিকো

উয়েনোর প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় হাচিকো তার মালিককে সিবুয়া ট্রেইন স্টেশনে দিয়ে যেত আর বিকালে ফেরার সময় স্টেশন থেকে নিয়ে যেত।

১৯২৫ সালের এক সকালে হাচিকো তার মালিককে অফিসে যাওয়ার সময় স্টেশনে দিয়ে। কিন্তু সেদিন হাচিকোর মালিক উয়েনো ইউনিভার্সিটিতে মস্তিস্কের রক্তক্ষরনে মারা যান।

প্রতিদিনের মত সেদিন বিকেলে ও হাচিকো তার মালিক কে আনতে স্টেশনে যায়। কিন্তু তার মালিক আর ফিরেনি।

এরপরে থেকে প্রতিদিন বিকালে কুকুরটি স্টেশনে তার মালিকের ফেরার অপেক্ষা করতে থাকে। একসময় সারাক্ষণ স্টেশনে পড়ে থাকতে শুরু করে হাচিকো।

বিষয়টি স্টেশন কতৃপক্ষের নজরে এলে তারা ধাওয়া করেন কুকুরটিকে। কিন্তু না! কোন ভাবেই হাচিকোকে স্টেশন থেকে সরানো গেলনা। এক সময় স্টেশনের কাছে প্রফেসরের এক পুরান বাগান বাড়িতে থাকতে শুরু করে হাচিকো।

এভাবে কাটতে থাকে বছরের পর বছর।

হাচিকোর ঘঠনাটি পুরো জাপান জুড়ে জানাজানি হয়ে যায় ১৯৩০ সালে। প্রফেসর উয়েনোর এক ছাত্র হিরোকিচি সাইতো। তিনি আকিতো প্রজাতির কুকুরের উপর গবেষণা করছিলেন তখন।

তার গবেষনা মতে, তখনকার সময় মাত্র ৩০ টি আকিতো প্রজাতির কুকুর বেচে ছিল হাচিকো সহ। পরবর্তিতে তার বইয়ে হাচিকোর এই মনিবভক্তির কথা উল্লেখ করার পর গোটা জাপানে হাচিকো পরিচিত হয়ে উঠে বিশ্বস্ততার প্রতিক হিসেবে।

হাচিকোর আসল নাম “হাচি” কিন্তু জাপানিরা তার নামের শেষে “কো” শব্দটি যুক্ত করেছেন তাদের ভালবাসা প্রকাশ এর জন্যে।

পরবর্তিতে ১৯৩২ সালের ৪ অক্টোবর “আসাহি শিম্বুন” পত্রিকাতে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয় হাচিকোকে নিয়ে।

এর পর দূর দূর থেকে মানুষ জন হাচিকোর জন্য খাবার নিয়ে আসা শুরু করে। আর হাচিকো প্রফেসরের অপেক্ষায় থাকে।

১৯৩৫ সালের ৮ই মার্চ মারা যাওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত হাচিকো স্টেশনে অপেক্ষারত থাকে। ৯ বছর ৯ মাস ১৫ দিন অপেক্ষার পর মৃত্যু হয় বৃদ্ধ হাচিকোর।

হাচিকোর ভাস্কর্য

জাপানের অনেকগুলো গুরুত্বপুর্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে হাচিকোর ভাস্কর্য।

যে স্টেশনে হাচিকো অপেক্ষা করতে সেখানে বানানো হয়েছে হাচিকোর একটি ভাস্কর্য। শহরে আসা পর্যটকদের মুল আকর্ষণ এটি।

ভাস্কর্যটি হাচিকোর মৃত্যুর এক বছর আগে উদ্ভোদন করা হয় যেখানে হাচিকো নিজেও উপস্থিত ছিল।

সিবুয়া স্টেশনে হাচিকোর ভাস্কর্য

২০১৫ সালে টোকিও ইউনিভার্সিটিতে স্থাপন করা হয়। মুলত এই ইউনিভার্সিটিক প্রাক্তন প্রফেসর ও উনার পোষা কুকুরটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নির্মান করা হয় ভাস্কর্যটি।

হাচিকোর ৮০ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে টোকিও ইউনিভার্সিটি কতৃপক্ষ এটি উন্মোচন করেন।

হাচিকো তার মালিক উয়েনোর সাথে মিলিত হয়েছে এই আদলে বানানো হয়েছে ভাস্কর্যটি।

টোকিও ইউনিভার্সিটিতে হাচিকোর ভাস্কর্য

চলচিত্র ও বই

১৯৮৭ সালে মুক্তি জাপানিজ চলচিত্র “Hachi:kō”। সিনেমার শেষ ভাগে হাচিকো ও প্রফেসরের একটি কাল্পনিক মিলিত হওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়।

সিনেমা তখন জাপানের সব রেকর্ড ভেঙ্গে ব্লকবাস্টার ছবির খেতাব পায়।

জাপানি মুভি Hachi:kō

২০০৯ সালে হলিউডের পরিচালক লাসসে হালস্ট্রোম হাচিকোর জীবনি ও মালিকের প্রতি ভালবাসা ও বিশ্বাস অবলম্বনে নির্মান করেন “Hachi: A Dog’s Tale” সিনেমাটি

হলিউড সিনেমার দৃশ্য

২০০৪ সাল পর্যন্ত জাপানের স্কুলে বাচ্চাদের বইয়ের বিষয়ে ছিল হাচিকো। বিষয়টির নাম ছিল “Hachiko: The True Story of Loyal Dog”

ফেইসবুকে যুক্ত হোন

শেয়ার করুনঃ
আরো পড়ুনঃ  ইন্টারনেটে কিছু মজার ওয়েবসাইট