সমুদ্রের গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চ

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের একটি খাত বা পরিখা। এটি বিশ্বের গভীরতম সমুদ্র খাত।এটি প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের ঠিক পূর্বে অবস্থিত।

মারিয়ানা খাত একটি বৃত্তচাপের আকারে উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ২৫৫০ কিমি ধরে বিস্তৃত। এর গড় বিস্তার ৭০ কিমি।

অধোগমন নামক এক ভৌগোলিক প্রক্রিয়ায় এই খাতটি গঠিত হয়েছে।

খাতটির দক্ষিণ প্রান্তসীমায় গুয়াম দ্বীপের ৩৪০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে পৃথিবীপৃষ্ঠের গভীরতম বিন্দু অবস্থিত।

এই বিন্দুর নাম চ্যালেঞ্জার ডীপ এবং এর গভীরতা প্রায় ১১,০৩৩ মিটার।

বিন্দুটি “এইচ এম এস চ্যালেঞ্জার ২” জাহাজের নামে নামকরণ করা হয়েছে; এই জাহাজের নাবিকেরাই বিন্দুটি ১৯৪৮ সালে আবিষ্কার করে।

নামকরন

স্পেনের রাজা চতুর্থ ফিলিপের রানি ছিলেন মারিয়ানা। তাঁর নামেই নামকরণ হয়েছিল প্রশান্তমহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের। ষোড়শ শতকে সেগুলি ছিল স্পেনীয় উপনিবেশ।

উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে এই দ্বীপগুলি আসলে ডুবে থাকা কিছু ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির চূড়া।

২৫৫০ কিমি লম্বা এবং ৭০ কিমি চওড়া এই সামুদ্রিক খাতের নাম দেওয়া হয়েছে নিকটবর্তী দ্বীপপুঞ্জের নামেই।

ফলে গভীরতম খাত ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’-এর পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে স্পেনের রানির নাম।

গভীরতা

এর গভীরতা ১১০৩৩ মিটার। মানে যদি মাউন্ট এভারেস্টকে এর মধ্যে বসিয়ে দেওয়া যায়, তা হলে আরও প্রায় দু’কিমি বা ১.৬ মিটারের মতো জায়গা বাড়তি পড়ে থাকবে।

অর্থাৎ পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গের থেকেও আয়তনে বড় বিশ্বের গভীরতম খাত।

আরো পড়ুনঃ  বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলঃ বিজ্ঞান নাকি অলৌকিক

গবেষকদের মতে, পৃথিবীর অভ্যন্তরে যখন দু’টি টেকটনিক পাতের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তখন একটি পাত দ্বিতীয়টির নীচে ঢুকে গেলে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মতো গভীর সামুদ্রিক খাতের সৃষ্টি হয়।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের প্রানীজগত

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের অন্ধকার গভীরে রয়েছে হাজার হাজার প্রাণীকুলের অস্তিত্য। বিজ্ঞানিদের মতে, এখানে রয়েছে অনাবিস্কৃত বহু প্রজাতির জীব।

এই খাতের প্রতিকুল পরিবেশে প্রাণীগুলো ঠিকে আছে বছরের পর বছর ধরে।

চলুন দেখা যাক কি কি রয়েছে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ এর গভীরে

১-৬ ফুট গভীরতায় ছোট খাট সামুদ্রিক মাছ ও সাতারোদের দেখা মিলবে।

৬৫ থেকে ১৩৫ ফুট গভীরতায় স্কোবা ডাইভাররা কোন যন্ত্র ছাড়া ডাইভ করতে পারেন।

২০০ ফুট গভীরতায় ওরকা নামের তিমি বাস করে

২৩০ ফুট গভীরতায় রয়েছে হোয়েল শার্ক। এদের ওজন ৬০ টনের ও বেশি হয়ে থাকে এবং এরা ১৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

৬৬০ ফুট গভীরতায় রয়েছে অরফিশ। মাঝে মাঝে এরা পানির উপরে ভেসে আসে।

৯৮০ ফুট গভীরে বাস করে জাপানিজ কাকড়া। লাল রঙের এই কাকড়া লম্বায় ১.৫ ফুট হয়ে থাকে।

১৬৫০ ফুট গভীরে দেখা মিলবে পৃথীবির সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমির।

বুর্জ আল খালিফা, দুবাই

২৭২৩ ফুট। যেখানে বুর্জ খালিফাও ডুবে যাবে। এখান থেকে সমুদ্রের অন্ধকার এলাকা শুরু। এখানে সুর্যের আলো পৌছায় না।

২৯৫০ ফুট গভীরতায় দেখা মিলবে জায়ান্ট স্কোইডের । সমুদ্রে এরাই একমাত্র প্রাণী যে তিমি মাছের সঙ্গে লড়াই করতে পারে।

আরো পড়ুনঃ  এন্টার্কটিকা মহাদেশের ২০ টি অজানা তথ্য

৩৩০০ ফুট। এই গভীরতাকে মিডনাইট জোন বলা হয়। এখানে পানির চাপ এতই বেশি যে, কেউ যদি সাবমেরিন ছাড়া এখানে আসে পানির প্রবল চাপে নিমিষেই ফেটে টুকরা টুকরা হয়ে যাবে।

৩৬০০ ফুটে রয়েছে আগ্নেয়গীরি ওয়েষ্ট মাটা (West Mata) ২০০৯ সালে সর্বশেষ এখানে উদ্গীরন হয়েছিল।

বিজ্ঞানিরা ক্যামেরায় রেকর্ড ও করেছিলেন সেই দৃশ্য।

৪২০০ ফুট গভীরতায় যদি আপনি যেতে পারে তবে আপনাকে স্বাগতম জানানোর জন্য রয়েছে সাদা শার্ক ( White Shark)।

এদের দেখার জন্য সুর্যের আলোর দরকার হয় না। গন্ধের মাধ্যমে এরা চলাচল করে।

এই গভীরতায় আরেকটি সুন্দর প্রাণী রয়েছে। লেদারব্যাক কচ্ছপ (Leatherback Turtle) । এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রজাতির কচ্ছপ।

৬৬০০ ফুট গভীরতায় আপনার সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে ব্ল্যাক ড্রাগনফিশের (Black Dragon Fish) ।

সমুদ্রের এই অন্ছলে রয়েছে এদের আধিপত্য।

৭৪০০ ফুট গভীরতায় দেখা মিলবে স্মার্ম হোয়েলের (Sperm Whale)। এরা ৬২ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

এটি এদের ঘুরে বেড়ানোর শেষ সিমানা। এর বেশি পানির চাপ এরা সহ্য করতে পারে না।

১৫০০০ ফুট গভীরে যখন আপনি যাবেন, আপনাকে পথ দেখাতে বাতি নিয়ে অপেক্ষা করবে এ্যঙ্গলার ফিশ (AnglerFish) ।

এদের মুখে রয়েছে ভয়ংকর দাঁত আর মাথার উপরে রয়েছে একটি বাতি।

এই এলাকায় ব্ল্যাক সেওলার ( Black Sweller) নামের আরেকটি প্রাণীর দেখা মিলবে। এরা নিজেদের চেয়ে দ্বীগুন প্রাণী ও গিলে ফেলতে পারে।

সমুদ্র এখন ১৮৯০০ ফুট গভীর । মারিয়ানার এই গভীরতায় দেখা মিলবে জাহাজ এস এস রিও গ্রান্ড ( SS Rio Grande) এর।

আরো পড়ুনঃ  চারটি রহস্যময় দরজা যা কখনোই খোলা হয় না

১৯৪১ সালে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে জাহাজটি ডুবে যায়। যদিও মাত্র ৫০ বছর আগে এটি আবিস্কার হয়।

২৬০০০ ফুট। এখানে দেখা মিলবে সুন্দর মাছ স্ন্যাইল ফিশের (Snail Fish) । এরা এতটাই স্বচ্ছ যে এদের ভেতর দিয়ে অপর পাশ দেখা যায়।

সমুদ্রের বিশাল চাপে এরা কিভাবে ঠিকে আছে তা বলা মুশকিল তবে গবেষকরা হাল ছাড়েন নি।

৩৫৮৫৩ ফুট । এই অংশের নাম চ্যালেন্জার ডীপ। পৃথীবির একেবারে তলদেশ। এখন পর্যন্ত এর চেয়ে বেশী গভীরতা আবিস্কার হয়নি। এটি মারিয়ানার শেষ পয়েন্ট।

এই অঞ্চল সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়নি কারন এখানে খুবই অল্প সংখ্যক গবেষক ই যেতে পেরেছেন। তবে ভবিষ্যতে হয়ত আরো অনেক রহস্য উৎঘাটন হবে।

পরিবেশ দূষন ও পানি দূষনের হাত থেকে রেহায় পায়নি মারিয়ানার গভীরতাও। পলিথিন ও প্লাষ্টিকের অস্তিত্য পাওয়া গেছে মারিয়ানায়। দূষনের কারনে জীব বৈচিত্র হারাচ্ছে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ।

#Mariana_Trench #মারিয়ানা_ট্রেঞ্চ